রবিবার । ৩১শে মে, ২০২৬ । ১৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস আজ

এড. মাসুম বিল্লাহ

বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর তামাকজনিত কারণে প্রায় ৮০ লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ৭০ লক্ষ সরাসরি ধূমপানকারী এবং বাকিরা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ, কারণ এখানে সচেতনতার অভাব, সস্তা মূল্য নির্ধারণ এবং তামাক কম্পানির কুটকৌশল ও লবিংয়ের কারণে তামাকের ব্যবহার কমানো কঠিন।

প্রতি বছর ৩১ মে তারিখটিকে স্থায়ীভাবে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো তামাক ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি, মৃত্যু এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা, তামাক কোম্পানিগুলোর অসাধু ব্যবসায়িক কৌশল উন্মোচন করা এবং ব্যক্তি, সমাজ, সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে একত্রিত করে তামাকমুক্ত একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।

২০২৬ সালে এ বছরের প্রতিপাদ্য “Unmask the Appeal – Countering Nicotine and Tobacco Addiction” বাংলায় ভাব অনুবাদ করা হয়েছে “প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি”। এই থিমটি বিশেষভাবে তামাক শিল্পের আকর্ষণীয় মার্কেটিং কৌশলগুলোকে উন্মোচিত করে যুব সমাজকে সুরক্ষিত করার উপর জোর দিয়েছে।

প্রতি বছর ৩১ মে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশেও পালিত হয় বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস, বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশের সকল বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় প্রতিবছর অল্প হয়ে আসছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তামাক কোম্পানি শুধু স্বাস্থ্য নয়, পরিবেশ, জলবায়ু এবং অর্থনীতির উপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে তামাক খাত থেকে রাজস্ব আসে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার উপরে, কিন্তু স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষতি তার চেয়ে বহুগুন বেশি। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে তামাকের কারণে বছরে স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার ক্ষতি প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তামাক চাষের ফলে জমির উর্বরতা হ্রাস, বন উজাড় এবং পরিবেশ দূষণ হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় দুই লক্ষ মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা যায় এবং যুবকদের মধ্যে আসক্তির হার ক্রমাগত বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে সমন্বিত প্রচেষ্টা খুবই জরুরি। সরকার, বেসরকারি সংস্থা, যুব সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং মিডিয়াকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। FCTC-এর Article 5.3 পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, CSR-এর নামে প্রচারণা পুরোপুরি নিষিদ্ধকরণ, যুবকেন্দ্রিক মার্কেটিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি, শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার এবং কর বৃদ্ধির মাধ্যমে তামাকের সহজলভ্যতা কমানো দরকার। তামাকমুক্ত বাংলাদেশ শুধু একটি সরকারি লক্ষ্য নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ জীবনের অধিকার। প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করে আমরা যদি একসঙ্গে দাঁড়াই, তাহলে অবশ্যই এই লড়াইয়ে জয়ী হব।

তামাক কোম্পানিগুলো শুধু যুব সমাজ নয়, সরকারি নীতি প্রণয়ন পর্যায়েও লবিং করে। সরকারেরও BATB-এ উল্লেখযোগ্য শেয়ার রয়েছে, যা প্রায় ০.৬৪ শতাংশ। এই শেয়ারের কারণে সরকারি কর্মকর্তারা কোম্পানির বোর্ডে অংশগ্রহণ করেন, যা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করে। FCTC-এর Article 5.3 অনুসারে তামাক কম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থ থেকে স্বাস্থ্য নীতিকে সুরক্ষিত রাখার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। কোম্পানিগুলো থার্ড-পার্টি গ্রুপ, মিডিয়া এবং ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেল ব্যবহার করে নীতি প্রণয়নে প্রভাব বিস্তার করছে। এতে করে তামাক কর বৃদ্ধি, বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধকরণ এবং অন্যান্য কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (BATB), দেশের তামাক বাজারের একটি বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি বলে অনুমান করা হয়। এই কোম্পানি শুধু ব্যবসায়িকভাবে নয়, বরং সামাজিকভাবে নিজেদের ইমেজ তৈরি করতে বিভিন্ন কর্পোরেট সামাজিক দায়িত্ব (CSR) কর্মসূচি চালায়।

কিন্তু এই CSR কার্যক্রমগুলো আসলে তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতিতে প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশল হিসেবে কাজ করে। এছাড়া BATB-এর “Battle of Minds” নামক ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তারা তরুণদের মধ্যে ব্র্যান্ড লয়ালটি তৈরি করে এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য কর্মী ও সমর্থক গড়ে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন